১৩ ফেব, ২০১৮

মানুষের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছু কথা ও জ্যোতিষবিদ্যা।



ব্যক্তির আকৃতি, গঠন, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, শিক্ষণ, বুদ্ধি, চরিত্র, অভ্যাস, মেজাজ, আচার-আচরণ, অনুভূতি, মনোভাব, প্রেষণা, তাড়না, প্রবনতা, উপলব্দি, আকাঙ্খা, আবেগ, আগ্রহ, অনুরাগ, দৃষ্টিভঙ্গী, মূল্যবোধ, আদর্শ ও বিশ্বাস সবকিছুর সমন্বিত রূপই ব্যক্তিত্ব। যা তাকে অনন্যতা দান করে। মনোবিজ্ঞানী ক্রাইডার এবং অন্যান্যদের মতে- “ব্যক্তিত্ব হল ব্যক্তির মনোদৈহিক প্রক্রিয়া সমূহের এক গতিময় সংগঠন যা পরিবেশের সাথে তার অনুপম অভিযোজন নির্ধারন করে।” এছাড়াও অন্যান্য মনোবিজ্ঞানীগণ বিভিন্নভাবে ব্যক্তিত্বের ধারনা প্রদান করেছেন। সার কথা হল- কতগুলো বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলীর সংগঠনকে ব্যক্তিত্ব বলে। জৈব, মানসিক, সামাজিক বিষয়াবলীর পারস্পরিক ক্রিয়া ব্যক্তিত্ব সংগঠনের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে।
দেহের রাসায়নিক ক্রিয়া ও ব্যক্তিত্বের মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে তা অস্বীকার করা যায়না। মনোবিজ্ঞানীরা একমত যে, ঔষধ, রক্তের উপাদানের বিশেষ হার, খাদ্য, ব্যাধি এবং  অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির রসক্ষরণের প্রভাব ব্যক্তিত্বের বিকাশের উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। যেমন, যাতনা নিবারক ঔষধ সমূহে মস্তিষ্কের ক্রিয়া নিস্তেজ করে এবং শক্তির অপচয় করে। সূরাসার মস্তিষ্কের নিয়ামক ক্ষমতা নিস্তেজ করিয়া আপাত মধুর উত্তেজনা সৃষ্টি করে। মরফিন আরামদায়ক স্বপ্নাবেশ সৃষ্টি করে। রক্তে শর্করার হ্রাস-বৃদ্ধিতে মেজাজের পরিবর্তন ঘটে। উপযুক্ত খাদ্য উপাদানের অভাব ঘটিলে আমাদের দেহ ও মনের স্বাভাবিক সুস্থ্যতা ব্যাহত হয়। হৃদরোগ, পাকাশয়িক গোলযোগ, সিফিলিস, পক্ষাঘাত, নিদ্রাহীনতা, অকালবার্ধক্য প্রভৃতি ব্যাধি দেহকে বিপর্যস্ত করিয়া মনের অবসন্নতা আনয়ন করে। কাজেই সেসব ব্যক্তি সকল অবস্থার সহিত সামঞ্জস্য বিধান করিতে পারেনা। তাই বলা যায় ব্যাধিও ব্যক্তিত্বের উপর প্রভাব বিস্তার করে।
গ্রন্থিরস ব্যক্তিত্বের উপর অনেকটা প্রভাব বিস্তার করে। বহিঃক্ষরা গ্রন্থি সমূহ যেমন,- লালাগ্রন্থি, স্বেদগ্রন্থি, অশ্রুগ্রন্থি, মূত্রগ্রন্থি ও যৌনগ্রন্থি প্রয়োজনীয় রস বাহির করিয়া দিয়া দেহের স্বাভাবিক ক্রিয়া বজায় রাখে। এই সমস্ত গ্রন্থির ক্রিয়ায় বৈলক্ষণ্য দেখা দিলে ব্যক্তির আচরণের পরিবর্তন ঘটে ও তাহার ব্যক্তিত্ব প্রভাবিত হয়। বহিঃক্ষরা গ্রন্থির তুলনায় অন্তক্ষরা গ্রন্থির (Endocrine Gland) রসক্ষরণ বা নিঃসৃত হরমোন ব্যক্তিত্বের উপর অধিক প্রভাব বিস্তার করে। এই গ্রন্থিগুলির ক্ষরিত রস দেহের রক্তে মিশিয়া শরীরের বিবিন্ন অংশে ছড়াইয়া পড়ে। নিম্নে প্রধান অন্তক্ষরা গ্রন্থিসমূহের বিষয় আলোচিত হইল। এইগুলির স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক ক্রিয়ার ও নিঃসরনের উপর ব্যক্তির স্বাভাবিকতা ও অস্বাভাবিকতা অনেকাংশে নির্ভরশীল।
থাইরয়েড গ্রন্থি (Thyroid Gland): থাইরয়েড গ্রন্থির ক্ষরিত রসকে বলে থাইরক্সিন। থাইরক্সিন কম ক্ষরিত হইলে মানুষ ক্ষুদ্রকায়, দুর্বল ও অবসন্ন হয়। আর বেশি ক্ষরিত হইলে মাইক্সিডেমা নামক রোগ হয় এবং ব্যক্তিকে অস্থির, চঞ্ছল ও বিমর্ষ করিয়া তোলে।
অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি (Adrenal Gland): তার ক্ষরিত রসের নাম এড্রিনিন। এড্রিনিন বেশি ক্ষরিত হইলে ত্বক পুরু, চুল রুক্ষ্ম ও শুষ্ক এবং দাঁত বড় হইয়া থাকে। ইহা ব্যক্তিকে সাহসী করিয়া তোলে। নারীদের মধ্যে এই রসের প্রভাব কম। এই রস কম ক্ষরিত হইলে স্নায়বিক দৌর্বল্য আসে।
প্রজনন গ্রন্থি (Sex Gland): এই গ্রন্থি রসের প্রভাবেই পুরুষত্ব ও নারীত্ব নির্ধারিত হয়।
পিটুইটারী গ্রন্থি (Pituitary Gland): এই গ্রন্থির রস ক্ষরণের প্রাধান্য অনুসারে পৌরুষ, শারীরিক বিকাশ ও মস্তিষ্কের শক্তি বাড়ে। এই গ্রন্থির রস কম ক্ষরিত হইলে জননেন্দ্রিয়ের ক্ষুদ্রতা, চেহারার খর্বতা, নির্বুদ্ধিতা ও সর্বাঙ্গীন অবনতি ঘটে।
তাই বলা যায় এই সকল অন্তক্ষরা গ্রন্থির রসক্ষরণ মানুষের ব্যক্তিত্বের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
ব্যক্তিত্বের মাপকাঠি বিভিন্ন হওয়ায় ব্যক্তিত্বের শ্রেণীকরণ সম্পর্কে মনোবিজ্ঞানীরা একমত নন। বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন শ্রেণীকরণ করেছেন। নিম্নে ব্যক্তিত্বের কতকগুলি সুপ্রসিদ্ধ শ্রেণীকরণ সম্পর্কে আলোচনা করা হল:-
উইলিয়াম জেমস্ মানুষকে কোমল ও কঠোর (Tender-Minded and Tongh-Minded) এই দুই দলে বিভক্ত করেছেন। কোমল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ব্যক্তি নীতির অনুসারী, ভাববাদী ও ধর্মে বিশ্বাসী। তারা ভাবলোকের অধিবাসী। আর যারা কঠোর ব্যক্তিত্বের অধিকারী তারা নির্মমবাস্তবকে অনুসরন করে, ধর্মে বিশ্বাস করেনা এবং সন্দেহ পরায়ণ হয়ে থাকে।
জার্মান মনোবিজ্ঞানী ইয়ং (Jung) ব্যক্তিত্বের তিনটি শ্রেণীবিভাগ করিয়াছেন- বহির্মূখী, অন্তর্মূখী এবং উভয়মূখী।
বহির্মূখী ব্যক্তিত্ব (Extrovert Personality): যারা এই জাতীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী তারা বহির্জগতকে কেন্দ্র করিয়াই মাতিয়া উঠে। তাদের নিজেদের প্রতি তেমন লক্ষ্য নাই, যেমন রহিয়াছে অন্যদের প্রতি। নিরপেক্ষভাবে প্রতিটি বিষয় বিবেচনা করা তাদের অভ্যাস। তারা সামাজিক প্রকৃতির বলে সমাজের বিভিন্ন ক্রিয়া-কর্মে তাদের সক্রিয় সহযোগিতা পাওয়া যায়। তারা চঞ্চল ও কর্মপ্রিয়। সাহিত্য, শিল্পকর্ম বা দর্শন তাদের পছন্দ হয়না। তারা সৌন্দর্যের পূজারী নয়। জীবনের যেকোন অবস্থার সহিত সামঞ্জস্য বিধান করিবার ক্ষমতা তাদের আছে। খেলাধূলা, ব্যবসা-বানিজ্য, বিদেশ সফর প্রভৃতি তাদের নিকট অতিপ্রিয়। নূতনকে জানিবার দূর্বার আকাঙ্খা থাকে তাদের এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।
অন্তর্মূখী ব্যক্তিত্ব (Introvert Personality): যারা অন্তর্মূখী ব্যক্তিত্বের অধিকারী তারা নিজেদের মানস জগতের মধ্যে আত্মমগ্ন হয়ে থাকতে চায়। বহির্জগতের প্রতি তেমন কোন আকর্ষণ অনুভব করেনা। তারা নিজেদের চিন্তা, অনুভূতি ও আদর্শের মধ্যে তৃপ্তি খুঁজিয়া থাকে। অন্তরের আবেদনকেই সর্বাধিক গুরুত্ব প্রধান করে। তারা সাধারণত: অধ্যয়ন, রচনা, চিত্রাঙ্কন, দর্শন ইত্যাদিতে আকৃষ্ট হয়। চিন্তা ও কল্পনাপ্রধানক্রিয়া তাদের নিকট প্রিয়। চিন্তাশীল, আবেগপ্রবণ, সংবেদনশীল ও কল্পনাবিলাসী এই লোকগুলি আত্মবিশ্লেষণে নিপুন হইলেও যেকোন নূতন পরিবেশে দ্রুত খাপ খাওয়াইয়া চলিতে অক্ষম। তাদের মধ্যে সামাজিকতাবোধের অভাব থাকে।
উভয়মূখী ব্যক্তিত্ব (Ambivert Personality): ব্যক্তিত্বের উপরোক্ত শ্রেণীবিভাগ সর্বত্র প্রযোজ্য নয়। যাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় তারাই উভয়মূখী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তারা মধ্যবর্তী শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত। তারা আত্মসচেতন হয়েও সামাজিক পরিবেশের প্রতি উদাসীন নয়। উভয়মূখী ব্যক্তিত্ব মূলত: বহির্মূখী ও অন্তর্মূখী ব্যক্তিত্বের সংমিশ্রন।
আরেকজন জার্মান মনোবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক ক্রেৎসমার (Kretschmer) মানসিকতার সহিত দৈহিক গঠন ও বৈশিষ্ট্যের যোগসূত্র স্থাপনের প্রয়াস পাইয়াছিলেন। তিনি ব্যক্তিত্বের চারটি শ্রেণী নির্দেশ করিয়াছেন। যথা- পিকনিক (Pynik), এস্থেনিক (Asthenic), এথলেটিক (Aethletic) এবং ডিসপ্লাসটিক (Dysplastic)।
পিকনিক ব্যক্তিত্ব বিশিষ্ট ব্যক্তি মেদবহুল, সামাজিক, প্রিয়ভাষী ও আমোদপ্রিয়। তারা বহির্মূখী ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন, উদার ও সুঠামদেহী।
এস্থেনিক ব্যক্তিত্ব বিশিষ্ট ব্যক্তি লম্বা ও হাল্কা-পাতলা, ক্ষীণকায়, খিটখিটে, মৌনী, অসামাজিক, লাজুক ও সংবেদনশীল। তাদের আচরনের সাথে অন্তর্মূখী ব্যক্তিত্বের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
এথলেটিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী ব্যক্তির দৈহিক গঠন দৃঢ়, হস্তপদ দীর্ঘ, বক্ষ প্রসারিত ও গ্রীবা প্রশস্ত। তারা শক্তিশালী ও আক্রমনাত্মক স্বভাবের।
ডিসপ্লাসটিক ব্যক্তির গৌণ যৌনলক্ষণসমূহ অবিকশিত। তাদের দৈহিক গঠন ও বৃদ্ধি সামঞ্জস্যবিহীন। তারা দৈহিক বিকলাঙ্গতার কারনে হীনমন্যতায় ভোগে এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরন করে।
মনোবিজ্ঞানী ষ্প্রাঙ্গার (Spranger) জীবনের মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ হইতে ব্যক্তিত্বের নিম্নোক্ত শ্রেণীবিভাগ করিয়াছেন। যথা- তাত্ত্বিক, হিসাবী, সৌন্দর্যপ্রিয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধার্মিক।
তাত্ত্বিক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোকেরা হয় সত্যের সন্ধানী, দর্শন ও বিজ্ঞানে আগ্রহী। হিসাবী ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোকদের জাগতিক হিসাবের দিকে বেশি নজর থাকে। তারা বস্তুতান্ত্রিক হইয়া থাকে। সৌন্দর্যপ্রিয় ব্যক্তিত্বের অধিকারীরা সুন্দরের ধ্যান করে, জীবনকে আনন্দ ও সুন্দরের প্রকাশ হিসাবে দেখতে পায়। সামাজিক ব্যক্তিত্ব বিশিষ্ট ব্যক্তি মানবপ্রেমকেই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া মনে করে। মানুষের কল্যাণেই তাদের তৃপ্তি হয়। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোকেরা হয় ক্ষমতাপ্রিয়, অপরের উপর নিজেদের প্রভুত্ব বিস্তারে সর্বদা সজাগ। ধার্মিক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোকেরা পরম শক্তির উপর নির্ভর করিয়া জীবনের সার্থকতা খুঁজিয়া পান।
সমাজবিজ্ঞানী হল্যান্ড প্রকৃতি অনুযায়ী ব্যক্তিত্বকে ছয়টি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। যথা-
Realistic Personality : তারা স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। অন্যদের তুলনায় একটু বেশি লাজুক প্রকৃতির। সাধারনত কল্পনার চেয়ে বাস্তবতায় বেশি বিশ্বাস করে এবং কৃত্রিমতা অপছন্দ করে।
Investigative Personality : তারা যেকোন ক্ষেত্রে অনুসন্ধানমূলক আচরণ প্রদর্শন করে। প্রতিটি বিষয় বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। স্বাধীন চিন্তা ধারার বৈশিষ্ট্য বহন করে এবং কৌতুহলই হল আচরণের মূল বৈশিষ্ট্য।
Social Personality : তারা অতিমাত্রায় সামাজিক বলে সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহন করে। যেকোন পরিস্থিতির সাথে অতি সহজেই সামঞ্জস্যতা স্থাপন করতে পারে এবং সহযোগিতামূলক আচরণ প্রদর্শনই মূল বৈশিষ্ট্য।
Conventional Personality : তারা সমাজের প্রচলিত রীতি-নীতি আচার-আচরণের প্রতি অতিমাত্রায় শ্রদ্ধাশীল হওয়ায় সমাজের নিয়ম-কানুন মেনে চলে এবং অন্যকে মানতে উৎসাহিত করে। তাদের মধ্যে কল্পনাপ্রবনতার স্থান নেই, তারা বাস্তববাদী ও বিশ্লেষনাত্মক গুণাবলীর অধিকারী।
Enterprising Personality : তারা নতুন নতুন উদ্যোগ নিতে আগ্রহী। যেকোন কাজের চ্যালেঞ্জ গ্রহণে সর্বদা প্রস্তুত। আত্মবিশ্বাসী, কর্মপ্রিয় ও উচ্চাকাঙ্খী। বাস্তব অবস্থার অতি সহজেই সামঞ্জস্যতা স্থাপন করতে পারে এবং অন্যদেরও সে ব্যাপারে উৎসাহিত করতে পারে।
Artistic Personality : তারা আবেগপ্রবন ও শিল্পীসুলভ মনোবৃত্তির মানুষ। কল্পনার জগতে বাস করে এবং বাস্তববিমুখ প্রকৃতির হয়। আবেগের বশে অনেক কাজ করে ফেলে এবং আচরণে অনেক সময় বাতুলতা প্রকাশ পায়।
বিশিষ্ট সমাজ মনোবিজ্ঞানী সেলডন (Sheldon) মানুষের দৈহিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ব্যক্তিত্বকে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। যথা-
Endomorphy : তাদের দেহ গোলাকার, মেদযুক্ত উদর, তারা ভোজনবিলাসী, আরামপ্রিয়, বন্ধুসুলভ এবং সহজেই অন্যদের সাথে মিশতে পারে। আনন্দপ্রিয় ও শিথিল স্বভাবের মানুষ তারা।
Masomorphy : তাদের দৈহিক গড়ন শক্তিশালী, হাড় ও মাংসপেশী সুদৃঢ়, তারা সাহসী, উদ্যমী, উচ্চাভিলাষী ও প্রতিষ্ঠা প্রত্যাশী। উত্তেজিত স্বভাব, কর্তৃত্বশীল, অধ্যবসায়ী ও দুঃসাহসী প্রকৃতির মানুষ।
Ectomorphy : তারা দীর্ঘকায় কিন্তু ক্ষীণদেহী, হাত পা সরু, অসামাজিক, ভীতিপরায়ণ, নির্জনতাপ্রিয় ও আত্মকেন্দ্রিক। সংযমী, ভাবুক, চিন্তাশীল, নিঃসঙ্গপ্রিয় ও গোপনীয়তা তাদের পছন্দ।
ব্যক্তিত্ব একটি আপেক্ষিক, বিমূর্ত ধারনা হওয়ায় ব্যক্তিত্ব গঠনের উপাদান সমূহ চিহ্নিত করা বেশ জটিল বিষয়। তথাপিও বিভিন্ন মনোবৈজ্ঞানিক অভীক্ষায় ব্যক্তিত্ব বিকাশের বিভিন্ন উপাদান চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হল- জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক। একাধিক ব্যক্তির মধ্যে উক্ত উপাদান সমূহের প্রভাব সমভাবে ক্রিয়াশীল থাকলেও তাদের ব্যক্তিত্বের সংগঠনের ভিন্নতাও অসম্ভব নয়। তাই একই উপাদান সবসময়যে একই ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়না। আবার এই উপাদান সমূহের অন্তর্ভূক্তি ও প্রাধান্যতা নিয়েও বিভিন্ন মনোবিদদের মধ্যে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। তদোপরি এই উপাদান সমূহ আবার বিভিন্ন বিষয়ের সংমিশ্রনে গঠিত। নিম্নে ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপাদান সমূহ সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করা হল:-
(১) জৈবিক উপাদান (Biological Factor): ব্যক্তিত্ব বিকাশের আওতাভূক্ত জৈবিক উপাদানের মধ্যে জিন ও বংশগতি, দৈহিক গড়ন ও বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক উপাদান কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ ব্যক্তিত্বের ভিত্তি জৈবিক উপাদানের প্রেক্ষিতেই গড়ে ওঠে। নিম্নে এগুলো বর্ণনা করা হল :-
(ক) বংশগতি ও ব্যক্তিত্ব (Heredity and Personality): যে জৈবিক ও মানসিক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, ক্ষমতা বা প্রবণতা বংশ পরম্পরা সঞ্চালিত হয় তাকে বংশগতি বলে। আর এ বংশগতির সঞ্চালক হিসেবে কাজ করে জিন (Gene)। এই জিনের মাধ্যমে পূর্বপুরুষের বৈশিষ্ট্য সন্তানদের ব্যক্তিত্বে প্রতিফলিত হয়।
মাতৃগর্ভে ভ্রূণ সঞ্চারকালে পিতৃকোষ ও মাতৃকোষের মিলনে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমের জিন পূর্বপুরুষের বৈশিষ্ট্য নিয়ে নতুন কোষে সঞ্চালিত হয়। এগুলোর মধ্যে বিশেষ কিছু জিন ব্যক্তিত্ব গঠনে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। কোন জিনগুলি, কি ধরনের ব্যক্তিত্ব গঠনে, কিরূপ ভূমিকা নিবে, তা নির্ভর করে কিসের ওপর ? এর জবাব কি কোন বিজ্ঞান দিয়েছে ? এখনও  দেয়নি। তবে আমি বলব, অবশ্যই তৎকালীন গ্রহ-নাক্ষত্রিক প্রভাব দ্বারাই তাহা নির্ধারিত হয়। এজন্যই জন্মকালীন গ্রহ-নাক্ষত্রিক অবস্থান বিশ্লেষণকরে কোন শিশুর সারাজীবনের সম্পূর্ণ ছবি জ্যোতিষবিদ্যার মাধ্যমে অঙ্কন করা সম্ভব।
(খ) দৈহিক গঠন (Body Structure): দৈহিক গঠনের ভিত্তিতে মানুষের অনেক বৈশিষ্ট্য, গুনাবলী ও আচরণ কাঠামো গড়ে ওঠে, যেগুলো ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব সংগঠনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানীগণের পূর্বোক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা তাহা জেনেছি।
(গ) জৈব রাসায়নিক উপাদান (Bio-Chemical Substances): মানব দেহের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক উপাদানের মধ্যে অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ও তা থেকে নিঃসৃত হরমোন ব্যক্তিত্ব গঠন ও বিকাশে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। এগুলো শারীরিক গঠন নির্ধারণের পাশাপাশি আচরণগত অনেক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। সেসবও বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানীগণের পূর্বোক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা তাহা জেনেছি।
এছাড়াও আচরণের জৈবিক ভিত্তি হিসেবে কেন্দ্রীয় স্নায়ূতন্ত্রের থ্যালামাস ও হাইপোথ্যালামাস আচরণ কাঠামো নিয়ন্ত্রন ও পরিচালনার মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব বিকাশকে বিশেষভাবে প্রভাবাম্বিত করে।
(২) মনস্তাত্ত্বিক উপাদান (Psychological Factor): ব্যক্তির শরীর অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও বাহ্যিক পরিবেশের পারস্পরিক ক্রিয়ায় মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো গড়ে ওঠে। এই মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো ব্যক্তির আচরণ, চরিত্র, অভ্যাস, মনোভাব, আগ্রহ, ইচ্ছা, চিন্তা-চেতনা প্রভৃতিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করার মাধ্যমে ব্যক্তিত্বের সংগঠন ও বিকাশকে ত্বরাম্বিত করে। আর এই মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর উপাদান সমূহের উপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ব্যক্তি তার ব্যক্তিত্ব গঠনকে ইতিবাচক বা নেতিবাচক দিকে প্রভাবিত করতে পারে।
আমার কথা হল, যেহেতু মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো ব্যক্তির ইচ্ছাকেও প্রভাবিত করে তাই ইতিবাচক সুফল লাভের জন্য ব্যক্তিকে জোড়ালো ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করতে হবে। যেখানে তা সম্ভব হয়না, সেখানে জ্যোতিষবিদ্যার সঠিক দিক-নির্দেশনা গ্রহন ব্যতিত কোন বিকল্প নেই। তথা- সংখ্যা, তারিখ, রং, রত্ন, ধাতূ ইত্যাদি সম্পর্কে প্রদেয় পরামর্শ পূঙ্খানুপূঙ্খভাবে পালন করলে অবশ্যই ইতিবাচক সুফল পাওয়া যেতে পারে। এব্যাপারে অজস্র প্রমান দেয়ার মত মানুষ পাওয়া যাবে, যারা স্বীকার করে যে আমি রত্ন ধারন করে বা সংখ্যা-তারিখ অনুসরন করে সুফল পেয়েছি।
(৩) পরিবেশগত উপাদান (Environmental Factor): পরিবেশ একটি বিস্তৃত ধারনা যা প্রাকৃতিক, সামাজিক, পারিবারিক প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়কে আওতাভূক্ত করে। আর এই পরিবেশগত বিভিন্ন উপাদান সমগ্রজীবনব্যাপী ব্যক্তির বিকাশ ধারাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করনের মাধ্যমে ব্যক্তিত্বের গঠন কাঠামোর ভিত্তি রচনায় ও উন্নয়নে বিশেষভাবে ক্রিয়াশীল থাকে।
এ ছাড়াও ব্যক্তিত্ব গঠনে- শারীরিক গঠন, মেজাজ, বুদ্ধি, অনুরাগ ও মূল্যবোধ, প্রেষণা ও আবেগময় প্রবনতা, প্রকাশভঙ্গি প্রভৃতি সহায়ক উপাদানের ভূমিকাও কম নয়।
একজন মানুষকে আমরা যে রকম দেখি সে রকম না হয়ে তার কি কোন উপায় ছিল? কেন সে এরকম হল? কেন অন্য রকম হলনা? হতে চাইলেই কি হতে পারত? এই হওয়ার মধ্যে তার চাওয়ার বা চেষ্টার কি কোন অবদান আছে? এ রকম অজস্র প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি বছরের পর বছর ধরে। সর্বশেষ আমার সুদীর্ঘকালের গবেষণার ফল থেকে বলছি,- না, অমনটি না হয়ে তার কোন উপায় ছিলনা। যেমন ছিলনা তার জন্মস্থান, জন্মদাতা-ধাত্রী, জন্মতারিখ ও সময়ের উপর কোন অবদান। ঠিক তেমনি সবকিছুই তার অজ্ঞাতে এবং অনিচ্ছায় ঘটেছে। বলতে পারি প্রাকৃতিক নিয়মে। গ্রহ-নক্ষত্রও প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন। আর প্রকৃতি ও গ্রহ-নক্ষত্র সবই স্রষ্টার ইচ্ছাধীন। পবিত্র কোরআন শরীফেও আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন, সর্বত্রই নিয়মের চাকা বিদ্যমান। তাই বলব, স্রষ্টার নিয়মেই গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবে আমার আমিত্ব গঠন হয়েছে বা আমি আমার মত হতে পেরেছি। এ ব্যাপারে কোনই সন্দেহ নেই।
আমার উপরের প্রশ্নগুলির সন্তোষজনক অপর কোন উত্তর কারো জানা থাকলে আমি তা জানতে চাই। যদি তা কারো জানা না থাকে তাহলে আমার বক্তব্য মেনে নেয়া ছাড়া কারো কোন গত্যন্তর নেই।

১৩ জানু, ২০১৮

মানুষের বৈশিষ্ট্যের মূলে জিন, জিন বিন্যাসের মূলে গ্রহ-নাক্ষত্রিক প্রভাব, আর গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ন্ত্রিত হয় স্রষ্টার বেধে দেয়া নিয়মে।



মানুষে মানুষে যতই মিল থাকুকনাকেন বেমিল তথা পার্থক্য থাকবেই। এই পার্থক্য যেমন আকার-আকৃতি রূপ-লাবণ্যের, তেমনি চলার ছন্দ আচরণগত, তেমনি চিন্তা-চেতনা মানসিকতার। এগুলি বলে শেষ করার নয়। বিজ্ঞানীরা এই পার্থক্যের দুটি প্রধান কারন নির্দেশ করেছেন- বংশগতি (Heredity) পরিবেশ (Environment) বংশগতি বলতে পিতা-মাতা বা উর্দ্ধতন হইতে যাহা প্রাপ্ত তাহাকে বুঝায়। শিশু যাহা লইয়া জীবন আরম্ভ করে তাহাই বংশগতি। এর দ্বারাই ব্যক্তির জন্মগত দৈহিক মানসিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। শিশু যখন জন্মগ্রহন করে তখন তাহার জীবন আরম্ভ হয়না, তাহার জীবন আরম্ভ হয় মায়ের গর্ভধারনের সময় থেকেই। আর বংশগতির প্রবণতা মানুষের আয়ুষ্কাল অবধি চলতে থাকে। পরবর্তীতে এই বিষয়ে তত্ত্বগত প্রমান দেয়ার চেষ্টা করব 

পরিবেশ বলতে বুঝায়- জন্মস্থানের ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য, খাদ্য, গৃহ, সমাজ, ধর্ম, পারিপার্শ্বিকজন, শিক্ষা ইত্যাদিকে। বংশগতি শিশুর জন্মের সহিত তাহার স্বভাবের মধ্যেই নিহিত থাকে বলে বংশগতিকে প্রকৃতিও বলা হয়ে থাকে। আর পরিবেশ শিশুর প্রকৃতিগত নয়, অবস্থা হিসাবে তাহার সহিত অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থাকে। পরিবেশও তখন হইতেই আরম্ভ হয়, যখন মাতৃগর্ভে ভ্রূণের প্রথম সঞ্চার হয়

জীববিজ্ঞানীদের মতে- প্রত্যেক জীব এবং প্রত্যেক মানুষ দুই শ্রেণীর কোষ দ্বারা গঠিত। দেহকোষ (Body-Cell) এবং জননকোষ (Germ-Cell) বংশগতি জননকোষের সহিত সম্পর্কিত। প্রত্যেকটি প্রাণী সবসময় একটি করিয়া সজীব ডিম্বানু হইতে জীবন আরম্ব করে। মাতার ডিম্বানুর মধ্যে পিতার শুক্রকীট প্রবেশের ফলে মাতৃগর্ভে এককোষবিশিষ্ট (Unicellular) জীবকোষ (Zygot) সৃষ্টি হয়। ইহাই ভ্রূণের প্রথম সঞ্চার। প্রাকৃতিক নিয়মে মাতৃগর্ভের সজীব ডিম্বানু দ্বিধাবিভক্ত হইয়া দুইটি স্বতন্ত্র জীবকোষে পরিণত হয়। এই সময়ে উভয় জীবকোষ পিতা-মাতার জননকোষ হইতে সমসংখ্যক (মোট ২৪ জোড়া) ক্রোমোজোম লাভ করে। এই জীবকোষও দ্বিধাবিভক্ত হইয়া ক্রমশ বহু জীবকোষের সৃষ্টি করে। জীবকোষের সংখ্যা বৃদ্ধি জ্যামিতিক অনুপাতে ঘটিয়া থাকে

এই জীবকোষ এতই ক্ষুদ্র যে তাহা খালিচোখে দেখা যায়না, দেখতে হলে শক্তিশালী অনুবীক্ষণযন্ত্রের প্রয়োজন হয়। জীবকোষের বাহিরের আবরণকে বলে কোষপ্রাচীর। এই কোষপ্রাচীরের মধ্যে থাকে প্রোটোপ্লাজম প্রাণকেন্দ্র (Nucleus) প্রোটোপ্লাজম সজীব এবং কিছুটা ঘনীভূত তরল পদার্থ। আর প্রাণকেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস হইল একজাতীয় অস্বচ্ছ গাঢ় উপাদানে তৈরী এক গোলাকার পদার্থ। নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকে সুতারন্যায় ৪৮টি সূক্ষ্ম পদার্থ- যাদের নাম ক্রোমোজোম (Chromosome) এগুলি জোড়ায় জোড়ায় থাকে। তাদের অর্ধেক মাতৃকুল অর্ধেক পিতৃকুল হইতে আসে। অর্থাৎ ২৪ জোড়া ক্রোমোজোমের একটি পিতা এবং একটি মাতা হইতে আসিয়াছে বলিয়া প্রত্যেকটিতেই পিতা-মাতার দেহের উপাদান বিদ্যমান থাকে। তারমধ্যে ২৩ জোড়া A ক্রোমোজোম এবং একটিতে XY ক্রোমোজোমের আবির্ভাব ঘটিলে নর, আর ২৩ জোড়া B ক্রোমোজোম এবং একটিতে XX ক্রোমোজোমের আবির্ভাব ঘটিলে নারী শিশু জন্মায়। তার মানে ২৪ জোড়া ক্রোমোজোমের মধ্যে ২৩ জোড়া নারী-পুরুষের জন্য সমান এবং ২৪তম জোড়ার মধ্যেই লিঙ্গ নির্ণয়কারী পার্থক্য XY অথবা XX ক্রোমোজোম থাকে। উল্লেখ্য যে, একমাত্র পুরুষের জননকোষেই X Y উভয় ধরনের ক্রোমোজোম থাকে বলিয়া লিঙ্গ নিরূপণের ক্ষেত্রে পুরুষের জননকোষই প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে। প্রসঙ্গতঃ যে নারীকে এজন্য যুগে যুগে কত মূল্য দিতে হয়েছে নারী শিশু জন্মদানের অপরাধে! আরও উল্লেখ্য যে, একটিমাত্র X অথবা একসঙ্গে দুইটি X একটি Y কিংবা একসাথে একটি X দুইটি Y ক্রোমোজোম থাকিলে নপুংসক জন্মায়। সোবহান আল্লাহ্! যারা জন্মদাতা-দাত্রী মনে করেন নিজেদেরকে তারা একটু ভেবে বলুন X বা Y ক্রোমোজোম কি নিজেদের ইচ্ছা মাফিক সমন্বয় করতে পারবেন, নাকি আল্লাহ্ পাকের ইচ্ছায় হবে ?

এই ক্রোমোজোমের মধ্যে অবস্থিত জিনস্ (Genes) বংশগতির মূল উপাদান। জিনগুলি নানা প্রকার রাসায়নিক উপাদানের সংমিশ্রণে গঠিত। জিনও জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করে। নর-নারীর প্রতিটি জননকোষে ৫০৪ জোড়া জিন থাকে। এই জিনগুলি বিভিন্ন ক্রোমোজোমের মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপন করে বলে ক্রোমোজোমগুলিকে একটি মালা বা তসবিহের মত দেখায়

শিশু জন্মগ্রহণের পূর্বেইজেনিযৌনগ্রন্থির বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করিয়া থাকে। পরবর্তীকালে যৌনগ্রন্থি হইতে ক্ষরিত রস ছেলে মেয়ের ভিন্নমূখী বিকাশে সাহায্য করে। একজোড়া জিনের একটি পিতৃকুল এবং একটি মাতৃকুল হইতে লাভ করে বলিয়া শিশু উভয় বংশের ধারাবাহিকতা বজায় রাখিতে পারে এবং তাদের প্রবনতা অর্জন করে। পিতা-মাতার আকৃতি প্রকৃতিগত বৈসাদৃশ্যের ফলে সন্তান তাহাদের দেহকোষে বিপরীতধর্মী জিন লাভ করে। বিপরীতধর্মী জিনের একটি সবল এবং অপরটি দূর্বল হয়। ফলে সবল জিনটি প্রভাব বিস্তার করে। সেজন্যই দেখা যায় যে, সন্তানের জীবকোষের সবল জিনগুলিই তার আকৃতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করিয়া থাকে বলিয়াই পূর্বপুরুষদের সঙ্গে কিছুনা কিছু সাদৃশ্য থাকে; অবিকল এক রকম হয়না। উল্লেখ্য যে, সংকর জাতের শিশুদের বেলায় বিপরীতধর্মী জিন লাভের সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। কাজেই সন্তানের সঙ্গে পিতা-মাতা পূর্বপুরুষদের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যের মূলে জিনের প্রভাব অপরিসীম। সার কথা হল,- প্রত্যেকের দেহে জিনের বিন্যাস সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন হইয়া থাকে। তাই প্রত্যেক পিতা-মাতার সন্তানদের বংশগতি সাধারনভাবে একরূপ হইলেও সকলের বংশগতি এক নয়। প্রত্যেকটি শিশুর বংশগতি একান্তভাবেই তাহার নিজস্ব। তাই মানুষে মানুষে এত পার্থক্য

বিজ্ঞানীদের মতে- মাতৃগর্ভে ভ্রূণের প্রথম সঞ্চার তথা জীবকোষ সৃষ্টির সাথে সাথেই শিশুর পরিবেশ আরম্ভ হয়। পরিবেশকে প্রথমতঃ দুইভাগে বিভক্ত করা হয়,- জন্মের পূর্ববর্তী পরবর্তী। জন্মের পূর্ববর্তী পরিবেশকে আবার তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়। যথা- কোষাভ্যন্তরীণ, আন্তকৌশিক সাধারন। জন্মের পরবর্তী পরিবেশকে দুইভাগে বিভক্ত করা হয়, ব্যক্তিগত বস্তুগত। কোষাভ্যন্তরীণ পরিবেশ বলিতে কোষের মধ্যে অবস্থিত ক্রোমোজোম পরিবৃত্ত সাইটোপ্লাজম (Cytoplasm) কে বুঝায়। আন্তকৌশিক পরিবেশ হইল কোষ সমূহের পারস্পরিক প্রভাব। জন্মের পূর্ববর্তী সাধারন পরিবেশ বলিতে সেই তরল পদার্থকে বুঝায় যাহা ভ্রূণের চারিপাশে এবং রক্ত অক্সিজেনের মধ্যে অবস্থিত

জন্মের পরবর্তী পরিবেশ শিশুর জন্মের পরক্ষণ থেকেই আরম্ভ হয়। একই পরিবারের দুইজনের পরিবেশ স্থূলভাবে এক হইলেও প্রকৃতপক্ষে এক নয়। বস্তুগতভাবে পরিবেশ এক হইলেও ব্যক্তিগতভাবে একই পরিবেশের বিভিন্ন দিক বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিভিন্নভাবে হাজির হয়। তাই একই পিতা-মাতার বিভিন্ন সন্তান স্বতন্ত্র বা বিপরীত প্রকৃতির হয়ে থাকে। অনুকুল পরিবেশে ব্যক্তির সুপ্ত শক্তি সম্ভাবনা বিকশিত হয়। প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন ব্যক্তির উপর ক্রিয়া করিয়া তাকে কর্মঠ বা আয়াসী, শক্তিশালী বা দূর্বল, পরিশ্রমী বা অলস করিয়া তোলে; সামাজিক পরিবেশও তেমনি ব্যক্তির বিভিন্ন গুণ ক্রিয়া সম্পাদনে সাহায্য করিয়া তাহার শক্তির স্বাভাবিক বিকাশে অবদান রাখে। মূলতঃ শিশুর ভাবী ব্যক্তিত্বের কাঠামো তাহার পারিবারিক পরিবেশেই রূপ লাভ করিয়া থাকে। বংশগতির ফলে যে সমুদয় দোষ-গুণের অধিকারী হয় পরিবেশের প্রভাবেই উহাদের সম্যক বিকাশ ঘটে

সার কথা হল- শিশু কোন না কোন পরিবেশে জন্মগ্রহণ করে এবং বেড়ে ওঠে বংশগতি পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের জন্যই বংশগতিকে জন্মগত উত্তরাধিকার(Biological Heritage) এবং পরিবেশকে সামাজিক উত্তরাধিকার (Social Heritage) বলে

আমি মনেকরি, সেই গর্ভধারনকালে স্থানীয়ভাবে গ্রহ-নাক্ষত্রিক প্রভাব দ্বারা পিতা-মাতা প্রভাবিত হয় বলে প্রভাবানুযায়ী জিনবিন্যাস হয়ে থাকে ভ্রূণে। তার প্রভাবেই জীবনের ভিত গঠিত হয়। পরবর্তীতে ভূমিষ্ঠকালে যখন শিশুর নাভীরজ্জু (Umbilical Cord) কর্তিত হয় তখনকার স্থানীয় গ্রহ-নাক্ষত্রিক প্রভাব দ্বারা যে প্রভাবিত হয় পরোক্ষভাবে সেই প্রভাবেই জীবন কাটে। জ্যোতিষবিদ্যা সেই প্রভাব বিশ্লেষণের চর্চ্চা করে। গর্ভকালের প্রভাব নিয়ে কোন কথা বলেনা। আমি আরও মনেকরি, যদি গর্ভধারনক্ষণ সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয় তাহলে সে বিষয়েও পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব। আশাকরি আগামীতে প্রযুক্তির সহায়তায় সঠিক গর্ভধারনক্ষণ নির্ণয় করে সে বিষয়েও পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব হবে